গোপালের মাথায় পেরেক ঠুকতে ঠুকতে সাবিত্রীর অশোকের কথা মনে পড়ছিল। অশোক বলত, পৌত্তলিকতা যদি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের জন্ম দেয়, মানুষের মধ্যে সেই অন্ধবিশ্বাসটুকু থাকা ভাল।
সাবিত্রী এবার গোপালের বুকে ছোরা চালাল। রক্ত বেরোয়নি, মাটির গোপাল তো!
হাসপাতালের বিছানায় অশোক যেদিন ব্রেন ক্যানসারের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল, বারবার হাত ধরে জিজ্ঞেস করছিল....
'সাবিত্রী আমি বাঁচব তো?'
মরার আগেও ওকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছিল।
বিজ্ঞান আর চিকিৎসাবিদ্যার শেষে দর্শনশাস্ত্র শুরু হয়। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন এবার ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করুন, আমরা আর পারলাম না।
সাবিত্রী অশোককে বিছানায়ে রেখে লোকনাথ মন্দিরে গিয়ে মাথা কুটেছিল, তখন অশোকের ভারি গলার শ্লোক মনে পড়ছিল...
'অবিদ্যাহস্মিতা-রাগ-দ্বেষাভিনেবেশাঃ ক্লেশাঃ।।
জীবনের যন্ত্রণাদায়ক বাধাবিঘ্ন অজ্ঞতা, অহঙ্কারবোধ, আসক্তি, বিরূপতা ও জীবনের প্রতি মায়া থেকে আসে।
তাই বলে এত সহজে জীবনের মায়া থেকে অশোক মুক্তি নেবে? এর পর সাবিত্রী থাকবে কাকে নিয়ে? একটা সন্তানও তো দেননি ঈশ্বর..
গোপালের ছিন্নভিন্ন দেহ মেঝেতে পড়ে রয়েছে। মাটির মুন্ডুটা এক পাশে, আর এক পাশে হাত, পা আর শরীরের বাকি অংশ।
এভাবেই একদিন অশোকের শুকনো দেহটা আনা হয়েছিল, নামানো হয়েছিল বাড়ির উঠোনে। লোক জড়ো হয়েছিল। হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল সাবিত্রী। মৃত অশোকের পা ধরে ওকে জাগানোর চেষ্টা করেছিল, সেদিন অশোক ওঠেনি। কয়েক জন বয়স্ক বিধবা এসে অশোকের নিথর বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল এগিয়ে সাবিত্রীর সিঁথির সিঁদুর মুছিয়ে দিয়েছিলেন।
চার জন চার কাঁধে খাটিয়া উঠিয়ে নিলে পর ভাঙা হল হাতের শাঁখা পলা। টুকরোগুলো ছুড়ে দেওয়া হল আকাশের দিকে। কোনওটা পড়ল অশোকের বুকের উপর কোনওটা মুখে।
দশ দিন পর, মুছে দেওয়া হল শরীরের সমস্ত লাল রঙ।
সাবিত্রী প্রতি সন্ধ্যায় ককিয়ে ওঠে। আলো নিভিয়ে বসে থাকে। জীবনের সব আলো ভগবান কেড়ে নিয়েছে। ঘরে আর কোনও ঈশ্বর নেই, নেই কোনও পাথরের মূর্তি। অশোকের সঙ্গেই সেগুলো নদীতে ভাসিয়ে এসেছে।
উৎসবের দিনগুলোয় যন্ত্রণা বাড়ে সাবিত্রীর। ইচ্ছা হলেও স্বামী আর সন্তানের হাত ধরে ঘোরা হয় না। নিঃসন্তান সাবিত্রী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মন খারাপের মুহূর্ত গোনে। সেকেন্ডের কাঁটা যেন সরতে চায় না, এক একটা সেকেন্ড এক একটা গোটা দিন মনে হয়।
অথচ রাস্তায় বাচ্চা দেখলেই মমতার মেঘ ঘনায় সাবিত্রীর মনে। ইচ্ছে হয় থুতনিতে হাত রেখে, চিরুনি দিয়ে মাথার বাঁ দিকে সিঁথি করে আঁচড়ে দিতে। ইচ্ছে হয় বাড়িতে ডেকে ভালমন্দ রেঁধে খাওয়াতে। ইচ্ছে হয় জুতো মোজা পরিয়ে হাত ধরে রাস্তা পার করে সাবধানে স্কুল পৌঁছে দিতে।
সাবিত্রী ভাবতে থাকে, অন্যের সন্তান নিজের গর্ভে ধারণ করতে পারলে সে-ও তো মা হওয়া। সে সন্তান জন্ম দিতে পারলেও মা হওয়া সার্থক। সাবিত্রীর বড্ড ইচ্ছে হয় মা হতে। এক দিনের জন্যও যদি ভাড়াটে মা হওয়া যায়!
জীবনের সব দুশ্চিন্তা ঘরের মধ্যে তালা দিয়ে বাজারের ব্যাগ নিয়ে সাবিত্রী বেরোয়। রাস্তার বাচ্চাগুলোকে দেখলেই চকলেট দিতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করে কপালে স্পর্শ রাখতে। ওরা সাদরে 'মা' বলে ডাকে। চকলেট দিতে দিতে পাশের এক জন বলে উঠল....
- মা, পাশের ডাস্টবিনে একটা বাচ্চা পড়ে আছে, কান্না করছে। পাশে একটা কুকুর ঘেউঘেউ করছে।
- কোথায়?
দ্রুত পা বাড়ায়। বাচ্চাটা কোলে তুলে নেয়। বাঁপায়ের বুড়ো আঙুল নেই, কুকুরে দাঁত বসিয়েছে। রক্ত ঝরছে। অবিলম্বে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার।
হাসপাতালের এমার্জেন্সি বিভাগে ভর্তি করা হল।
পেশেন্টের নাম গোপাল, মায়ের নাম সাবিত্রী আর বাবার নাম ঁঅশোক।
কাগজে একটা পরিণত পরিবারের ছায়া দেখতে পাচ্ছে সাবিত্রী। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে সাবিত্রী। বাঁচানো সম্ভব হলেও হতে পারে, তবে এই মুহূর্তে ঈশ্বর-ই ভরসা। আবার ঈশ্বর!
পেমেন্ট করে দ্রুত লোকনাথ মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হয় সাবিত্রী।
শানের মেঝেতে মাথা ঠুকে প্রার্থনা করতে থাকে।
ভগবান! তুমি এত নিষ্ঠুর! অশোককে কেড়ে নিলে! অশোকের বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে আমার সিঁথির সিঁদুর কেড়ে নিলে! আমার গোপালের বাঁপায়ের বুড়ো আঙুল কেড়ে নিলে! এবার গোপালকেও কেড়ে নেবে?
সাবিত্রীর মাথার রক্ত ছিটকে যায় লোকনাথের কমন্ডলুতে।
......©.....
0 Comments
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন