হঠাৎ সাইকেলের চেনটা পড়ে গেল। আমি স্ট্যান্ড নামিয়ে চেন তোলার চেষ্টা করছিলাম। ইদানীং সাইকেলে ঘনঘন তেল দেওয়া হচ্ছে, তেল দিলে চেনে কালি জমে, চেন পড়লে সেই কালি হাতে লাগে।

এটা মুসলিম পাড়া। নাম গাজিপুর। একটি মেয়ে কলে স্নান করছে, বয়স আঠারোর মত... চুল খোলা... সবুজ রঙের চুড়িদার, চুড়িদারের নীচের অংশে গামছা জড়ানো....  সাবান ছিল, কোনও কমদামী কোম্পানির সাবান... এই ধরণের সাবান দোকানে কিনতে হলে কোম্পানির নাম বলতে হয়না, শুধু আট-দশ টাকা দামের সাবান চাইলেই দোকানদার বুঝে যায়....। সাবানের নীচে একটা কচুপাতা। কচু পাতায় জল দাঁড়াই না, কচুপাতা কিছুটা মানুষের পুরনো স্মৃতির মত, জল ওপর দিয়ে হাল্কা বয়ে যায়, যৎসামান্য লেগে থাকে। আমার হাতের কালি মোছা প্রয়োজন, তাই ভাবলাম একটু সাবান চাই....।

একদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। রাস্তায় কিছু স্কুল ফেরত মেয়ে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছিল। আমি ওদেরই একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমাদের সাইকেলে চাপাবে? কিছুক্ষণ পর দেখি আমার চারপাশে অনেক সাইকেল জড় হয়েছে। মনে হচ্ছিল আমি সূর্য আর আমার চারিপাশে সমস্ত গ্রহ-উপগ্রহ ঘোরাফেরা করছে। বুঝতেই পারছিলাম আজ মার খাওয়ার কাজ করেছি, তাই সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম...।

একটি ছেলে আমার নাম জিজ্ঞাস করলে, আমি বললাম আমার নাম আস্মত খাঁ। শুনে সবাই কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল, তারপর থেকে কোনও বিপদে পড়লেই আমার নাম আস্মত খাঁ বলি। কোনও ধর্মীয় বিতর্কে যাচ্ছিনা, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি হিন্দুদের মধ্যে  একতা বেশ কম...।

কোনও কোনও সময় হজরত মহম্মদ, ভগবান বুদ্ধ এবং শ্রীচৈতন্যদেবকে এক করে ফেলি আমি। প্রকটভাবে কোনও পার্থক্য খোঁজার চেষ্টা কোনওদিনই করিনি। এখনকার দিনে ধর্ম কোনওকিছুতেই বাঁধা না, কেবলমাত্র ভোটব্যাঙ্ক ছাড়া।

মেয়েটা আমার দিকে তাকালো। চোখের মণিটা বেশি মাত্রায় কালো, নখে সস্তার নেলপলিশ চটে গিয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে। মেয়েটার পায়ের লোমগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে.... এই মেয়েটাকে সুন্দরী কিছুতেই বলা যাবেনা, বুদ্ধিশুদ্ধি খুবই কম...। এই মেয়ে বিয়ে করা মানে এয়ারপোর্টে বসে তেল, কাঁচা লঙ্কা আর পেয়াজ দিয়ে মুড়ি খাওয়া।

'দাদা! সাবান নেবেন?'

এবার আমি আবার ওর মুখের দিকে তাকালাম। সত্যিই... কত মায়াভরা এ মুখ... কোনও চাকচিক্য নেই তবু চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে... সূর্যের ছটা কানের দুলে পড়ে একটা চকচকে আভা তৈরি হয়েছে...। দাদা! কেউ দাদা বলে ডাকলে ভাল লাগে শুনতে। খুব ভাল লাগে..  আমার কোনও বোন নেই, কেউ দাদা বলে ডাকেনা...

কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেছিলাম, মুখে কোনও আওয়াজ করিনি... অনেক সময় ভালোলাগা গুলো একান্ত নিজের... শুধুই নিজের... কোনও এক্সপ্রেশন দিয়ে কাউকে জানানোর প্রয়োজ হয়না...

তারপর এমনিই দুবার কল চেপে জল বের করে হাত ধুয়ে ফেললাম, পুরোটা কালির দাগ যায়নি... তাই বাকিটা মাথায় মুছে নিলাম... ঠিক সেভাবে মুছলাম, যেভাবে মা হাতে প্রসাদ দিলে শেষাংশ আশীর্বাদ স্বরূপ মাথায় মুছতাম....

Sudip Sen
17/03/16